বিশেষ প্রতিনিধি : ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ, অযৌক্তিক ‘ব্ল্যাকলিস্টিং’ (কালো তালিকাভুক্তকরণ) বন্ধ, ছাঁটাইকৃত শ্রমিকদের পুনর্বাসন ও গ্রেফতারকৃত শ্রমিকদের মুক্তির দাবিসহ নানা দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠেছে সাভার-আশুলি শিল্পাঞ্চল। সাভারের হেমায়েতপুর, উলাইল ও আশুলিয়া নিশ্চিন্তপুর এলাকায় পোশাকশ্রমিকদের বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়েছে।
বুধবার সকাল থেকে চলা দফায় দফা সংঘর্ষ ধাওয়া ও পাল্টা ধাওয়া এবং ইটপাটকেল নিক্ষেপে পুলিশ, সাংবাদিক, পথচারীসহ অর্ধশতাধিক আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা একটি পুলিশ ভ্যান ও মোটর সাইক আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়। অবরোধ করে রাখে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ার গ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড ও রাবার বুলেট ছোড়ে।
পুলিশের সাথে হেলমেট পড়া লাঠিয়াল বাহিনীও দেখা গেছে। অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে সাভার ও আশুলিয়ায় তিন প্লাটুন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েন করা হয়েছে। সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য নয় জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করছেন। ইতোমধ্যে শতাধিক কারখানা ছুটি ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ।
পুলিশ, প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, সকাল আটটার দিকে সুমিত্রা যথারীতি কারখানায় প্রবেশ করে। তারা কার্ড পাঞ্চ করে হাজিরা নিশ্চিতের পর আনুমানিক সাড়ে আটটার দিকে কারখানা থেকে বেরিয়ে যায়। পরে হেমায়েতপুরের পদ্মার মোড় এলাকায় জড়ো হয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। একপর্যায়ে তারা সড়কে অবস্থান নিলে পুলিশ তাদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। এ সময় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের উত্তেজনা দেখা দেয়। পরে শ্রমিকেরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করলে সংঘর্ষ শুরু হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ টিয়ার গ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড ও রাবার বুলেট ছোড়ে। এ সময় শ্রমিকেরা পুলিশের একটি গাড়ি ও একটি মোটরসাইকেল আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়।
সংঘর্ষে সাভার মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সাইফুল আলম, পুলিশ, শ্রমিক, সাংবাদিক ও পথচারীসহ অর্ধশতা দিক আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
সকাল সাড়ে নয়টার দিকে শ্রমিকরা কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে পদ্মার মোড়, হেমায়েতপুর বাসস্ট্যান্ড ও আশপাশের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নেন। হেমায়েতপুর সিংহের সড়কের বিভিন্ন স্থানে কাঠের টুকরো ফেলে আগুন ধরিয়ে দেয়।
শ্রমিকদের একটি গ্রুপ ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের হেমায়েতপুর বাস স্ট্যান্ড সড়ক অবরোধ করে দেয়। এতে মহাসড়কের উভয় পাশে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। যানবাহন আটকে পড়ায় যাত্রী ও সাধারণ মানুষ দুর্ভোগে পড়েন।
বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভের পাশাপাশি পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। তখন হেলমেট ও মুখোশ পরা লাঠি হাতে অনেক লোকজন দেখা গেছে। তারা শ্রমিক না বহিরাগত কেউ নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এদিকে বহিরাগত হেলমেট বাহিনী ও নৈরাজ্যকারীদের প্রতিহত করতে সাভারের তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়নসহ আশপাশের অধিকাংশ কারখানার সামনে অবস্থান নিয়েছেন বিএনপি ও এর অঙ্গ-সংগঠনের নেতাকর্মীরা।
বর্তমান সরকারকে শ্রমিকবান্ধব সরকার উল্লেখ করে তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়ন বিএনপি'র সাধারণ সম্পাদক আব্দুল আজিজ বলেন, "শ্রমিকদের এই আন্দোলন এখন আর শুধু শ্রমিকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। যারা বর্তমানে আন্দোলন ও ভাঙচুরের সঙ্গে জড়িত, তারা কেউ প্রকৃত শ্রমিক নন। আওয়ামী লীগের পেতাত্মা ও ছাত্রলীগের দোসররা শ্রমিক সেজে কারখানায় ভাঙচুর, জ্বালাও-পোড়াও এবং ব্লকেড তৈরি করছে।"
তিনি আরও অভিযোগ করেন, পার্শ্ববর্তী সিঙ্গাইর ও হেমায়েতপুর থেকে লোকজন এসে সাধারণ শ্রমিকদের সঙ্গে মিশে এই নৈরাজ্য সৃষ্টি করছে। তবে এদের কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্য সৃষ্টি করতে দেওয়া হবে না বলে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন তিনি।
সাভার মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মোশাররফ হোসেন জানান, শ্রমিকদের হামলায় ওসিসহ বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। পুলিশের তৎপরতায় সাভারের পরিস্থিতি বর্তমানে পুরোপুরি স্বাভাবিক রয়েছে এবং যানবাহন চলাচল শুরু হয়েছে। তবে অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে কারখানাগুলোতে ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে এবং পুরো এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন রাখা হয়েছে।
এদিকে একই সময় ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের উলাইল এলাকায় শ্রমিকেরা মহাসড়ক অবরোধের চেষ্টা করলে পুলিশের সাথে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়।
পুলিশ টিয়ার গ্যাস ও রাবার বুলেট ছুড়লে বিক্ষোভ দশমিকরাও পাল্টা ইট পাটকেল নিক্ষেপ করে। এ সময় অল মুসলিম গ্রুপের সামনে থাকা তাদের নিজস্ব হেলমেট ও লাঠিয়াল বাহিনী পুলিশের সাথে যোগ দিয়ে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
সাভারের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জানান, সাভার-আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলের নিরাপত্তায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) তিন প্লাটুন সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করছেন ৯ জন। তবে এপর্যন্ত কতগুলো কারখানা ছুটি অথবা বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে এমন কোন তথ্য তার কাছে নেই।
অন্যদিকে, বুধবার সকাল থেকেই আশুলিয়ার নরসিংহপুর ও নিশ্চিন্তপুর এলাকায় বিভিন্ন কারখানার ভেতরে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করছিলেন শ্রমিকরা। বেলা আনুমানিক সাড়ে ১১ টার দিকে শ্রমিকরা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে রাস্তায় নামার চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়। তখন আব্দুল্লাহপুর-বাইপাইল সড়ক রণক্ষেত্রে রূপ নেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। সংঘর্ষের কারণে আব্দুল্লাহপুর-বাইপাইল সড়কে সব ধরনের যানবাহন চলাচল কিছু সময় বন্ধ হয়ে যায়। ঘটনাস্থল থেকে উস্কানি দেওয়ার অভিযোগে পুলিশ মবিন নামের একজনকে আটক করে নিয়ে যায়।
অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে ওই এলাকায় বিজিবি টহল জোরদার করা হয়েছে।
নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আশুলিয়ার সহকারি কমিশনার (ভুমি) মহিবুল্লাহ আকন
জানান, আশুলিয়ায় কোথাও বিশৃঙ্খলা দেখা যায়নি। এতোমধ্যে বিজিবি মোতায়েছে হয়েছে।
সাভার ও আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে চলমান পোশাক শ্রমিক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মাঠে নেমেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।
বিজিবি-৫ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল তৈয়মুর হাসান খান জানান, পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় তারা কাজ করছেন। আন্দোলনের নামে কোনো প্রকার অরাজকতা সৃষ্টি বা রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি যাতে না ঘটে, বিজিবি সে বিষয়ে কঠোর সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিজিবি পুলিশ বাহিনীকে সর্বাত্মক সহায়তা প্রদান করবে।
সাভার-আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলের বর্তমান পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে জানিয়ে বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইন বিষয়ক সম্পাদক খাইরুল মামুন মিন্টু বলেছেন, "আশুলিয়ার অধিকাংশ কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে এবং শ্রমিকরা নিরাপদে নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে গেছেন।"
শ্রমিক নেতা ও সাধারণ শ্রমিকদের গ্রেফতার এবং মামলা-হামলার সমালোচনা করে তিনি বলেন, "এ ধরনের গ্রেফতার ও নিপীড়ন পরিস্থিতিকে আরও সহিংসতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।" তিনি দ্রুত গ্রেফতারকৃত শ্রমিক ও শ্রমিক নেতাদের নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানান।
কারখানায় বিশৃঙ্খলা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বহিরাগতরা সাধারণ শ্রমিকদের সাথে মিশে হামলা ও অরাজকতা সৃষ্টি করছে -যা মূলত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর স্পষ্ট ব্যর্থতার প্রমাণ।
আজ শ্রম আইনের প্রথম মিটিং সফল হয়েছে উল্লেখ করে এই শ্রমিক নেতা আন্দোলনরত শ্রমিকদের আর কোনো অরাজকতায় না গিয়ে শান্তিতে ঘরে ফেরার আহ্বান জানান।
সাভার ও আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের ক্ষোভ ও বিশৃঙ্খলা দেখা দিলেও বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে বলে জানিয়েছেন শিল্প পুলিশ-১ এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া।
তিনি জানান, আশুলিয়ায় শ্রমিকরা কিছুটা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছিল, তবে তা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে। অন্যদিকে সাভারেও বিশৃঙ্খলা এবং পুলিশের সাথে শ্রমিকদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছিল। পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার পর বর্তমানে উভয় এলাকার সার্বিক অবস্থা স্বাভাবিক রয়েছে।
তবে নিরাপত্তার স্বার্থে ও উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে সাভার ও আশুলিয়া অঞ্চল মিলে শতাধিক পোশাক কারখানা ছুটি দেয়া হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন এই পুলিশ কর্মকর্তা।