স্টাফ রিপোর্টার : ঢাকার সাভারের আমিনবাজারে সড়কের ওপর অটোরিকশা রাখা নিয়ে একজনকে মারধরের প্রতিবাদ করতে গিয়ে হামলার শিকার হয়ে মারা গেছেন পুলিশের স্পেশাল ব্র্যাঞ্চের (এসবি) উপ-পরিদর্শক (এসআই) আলতাফ হোসেন।
পুলিশ বলছে, ওই ঘটনার প্রতিবাদ করায় একপর্যায়ে আলতাফ হোসেন ও তাঁর ছেলে আরিফুল ইসলামকে ধাওয়া করে পাশের একটি গেঞ্জি কারখানায় ঢুকে হামলা চালানো হয়। সেখানে লাঠি দিয়ে তাঁদের মাথায় উপর্যুপরি আঘাত করা হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার পর ৫৮ বছর বয়সী আলতাফ হোসেনকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক।
এ ঘটনায় হামলার মূলহোতা প্রাইভেট কার চালক জহিরুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করেছে সাভার মডেল থানা-পুলিশ।পুলিশ জানিয়েছে, হামলায় জড়িত আরও ১১ জনকে শনাক্ত করা হয়েছে। তাঁদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
রবিবার সরেজমিনে ঘটনাস্থলে গিয়ে জানা যায়, শনিবার রাত ৮টা ২০ মিনিটের দিকে সাভার থানাধীন আমিনবাজারের বড়দেশি মদিনা সিটি মসজিদের পশ্চিম পাশে আলতাফ হোসেনের ছেলের গেঞ্জি কারখানায় এ ঘটনা ঘটে। আলতাফ হোসেন এসবির ঢাকার মার্কেট ইন্টেলিজেন্স শাখায় কর্মরত ছিলেন।
তাঁর গ্রামের বাড়ি সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর থানার (এনায়েতপুর) সাধুপাড়া গ্রামে। প্রয়াত জুরাইন আলী শেখের ছেলে আলতাফ হোসেন পরিবার নিয়ে সাভারের আমিনবাজারের বড়দেশি মদিনা সিটি এলাকায় বসবাস করতেন।
অটোরিকশা সরানো নিয়ে ঘটনার সূত্রপাত : প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, শনিবার রাতে নামাজ পড়তে বাসার কাছের মদিনা সিটি মসজিদের সামনে যান আলতাফ হোসেন।
মসজিদের পশ্চিম পাশে আবুল কালাম আজাদের একটি অটোরিকশার গ্যারেজ রয়েছে। গ্যারেজের সামনে সড়কের ওপর একটি অটোরিকশা রাখা ছিল। এ সময় উত্তর দিক থেকে চালকসহ চারজন একটি সাদা প্রাইভেট কারে করে সেখানে আসেন। সড়কে অটোরিকশা থাকায় তাঁদের চলাচলে কিছুটা বিঘ্ন ঘটে।
এ নিয়ে গাড়ি থেকে নামা ব্যক্তিদের সঙ্গে গ্যারেজের মালিক আবুল কালাম আজাদের কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে ওই ব্যক্তিরা আবুল কালাম আজাদকে কয়েকটি চড় মারেন।
ঘটনার সময় আলতাফ হোসেন প্রাইভেটকারটির কাছেই ছিলেন। আবুল কালাম আজাদকে কেন মারা হলো, তা জানতে চেয়ে তিনি প্রতিবাদ করেন। এ নিয়ে তাঁর সঙ্গে প্রাইভেটকারে আশা ওই ব্যক্তিদের কথা-কাটাকাটি শুরু হয়।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় বাসিন্দা খোরশেদ আলম বলেন, আলতাফ ভাই আসছেন নামাজের জন্য, আমিও যাব নামাজে। তখন দেখে, গ্যারেজ মালিককে মারছে। তখন আলতাফ ভাই বললেন, উনাকে মারছেন কেনো? ওরা বলে, তুই কে? বলেই তাকে ধরলো। উনার সঙ্গে যা হইছে, হয়তো আমার সঙ্গেও হতে পারতো। ঘটনা যারা ঘটালো, এটি একটি জঘন্য ঘটনা। আমি এদের বিচার চাই, কঠোর শাস্তি দাবি করছি।
গ্যারেজ মালিক আবুল কালামের ছেলে বলেন, উনি আমাদের প্রতিবেশি। এখানে উনার একটা গার্মেন্টস আছে। আমার বাবাকে যখন মারা হচ্ছিল, তখন ওই আঙ্কেল এসে জিজ্ঞেস করে কি হইছে? তখন আব্বুকে ছেড়ে দিয়ে ওনার ওপর ওরা হামলা করে । উনি যখন বলে আমি পুলিশের লোক। তারপরও উনাকে মারে। উনি মাটিতে পড়ে যায়। পরে উঠে দৌড়ে উনার গার্মেন্টসে ঢুকে পড়ে আত্মরক্ষার জন্য। সেখানে গিয়েও তাক ও তার ছেলেকে মারে। তারপর হাসপাতালে নিলে উনি মারা যায়।
ছেলের কারখানায় ঢুকেও হামলা : পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে আলতাফ হোসেন পার্শ্ববর্তী তাঁর ২৬ বছর বয়সী ছেলে আরিফুল ইসলামের মিনি গেঞ্জি কারখানায় আশ্রয় নেন। মসজিদের ওই স্থান থেকে কারখানাটির দূরত্ব প্রায় ৭৫ গজ।
[caption id="attachment_122" align="alignleft" width="400"]
নিহত আলতাফ হোসেন[/caption]
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযুক্ত ব্যক্তিরাও তাঁদের পিছু নিয়ে কারখানার ভেতরে ঢুকে পড়েন। সেখানে লাঠি দিয়ে আলতাফ হোসেন ও তাঁর ছেলে আরিফুল ইসলামের মাথায় উপর্যুপরি আঘাত করা হয়। ভাঙচুর করা হয় কারখানার ভিতরে। পরে হামলাকারীরা দ্রুত ঘটনাস্থল ছেড়ে চলে যান।
পরে আহত আলতাফ হোসেন ও তাঁর ছেলে আরিফুল ইসলামকে স্থানীয় লোকজন উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান।
রাত ৯টা ১৮ মিনিটে কর্তব্যরত চিকিৎসক আলতাফ হোসেনকে মৃত ঘোষণা করেন। তাঁর ছেলে আরিফুল ইসলাম গুরুতর আহত অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
আহত অবস্থায় ওই পুলিশ সদস্য ও তাঁর ছেলেকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া অটোরিকশাচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমার অটোতে করে দুইজনকে হাসপাতালে নিয়ে যাই। তখন উনার মাথায় রক্ত পড়ছিল।
শনাক্ত ১২, গ্রেপ্তার ১ : ঘটনার পর সাভার থানা-পুলিশ বিশেষ অভিযান শুরু করে। এ ঘটনায় নিহত পুলিশ কর্মকর্তার স্ত্রী শিউলি বেগম বাদী হয়ে রবিবার সকালে সাভার মডেল থানায় হত্যা মামলা করেছেন। মামলায় এজাহারনামীয় ১৫ জন এবং অজ্ঞাত আরও ১৫ থেকে ২০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, এ ঘটনায় প্রাইভেট কার চালক জহিরুল ইসলামকে (৩০) গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি সাভারের বড়দেশি এলাকার মোসলেম উদ্দিনের ছেলে।
সাভার মডেল থানার ওসি সাইফুল ইসলাম রবিবার দুপুরে জহিরুল ইসলামকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
ওসি বলেন, যার গাড়ি নিয়ে দ্বন্দ্ব, সেই ঘটনায় মূল অভিযুক্ত জহিরুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগীর স্ত্রী মামলা করেছেন। আসামির স্বীকারোক্তি, সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা ও বিভিন্নভাবে খোঁজখবর নিয়ে অন্য আসামিদের শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
ওসি আরো বলেন, এ ঘটনায় মোট ১২ জনকে শনাক্ত করা হয়েছে।তাঁদের মধ্যে জহিরুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকি ১১ জনকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
ঢাকা জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম, অপস অ্যান্ড ট্রাফিক) মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, সাভারের আমিনবাজারে যে ঘটনাটি ঘটেছে, সাভার মডেল থানায় মামলা হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অভিযান অব্যাহত থাকায় মামলার বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি। আমরা প্রাথমিকভাবে আসামিদের শনাক্ত করেছি।
এদিকে রবিবার সকালে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) এর একটি টিম ঘটনাস্থল পরিদর্শনে আসেন। তখন পিবিআই -এর ঢাকা জেলার পুলিশ পরিদর্শক মোহাম্মদ সোলায়মান গাজী সাংবাদিকদের বলেন, আমরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি এবং আমাদের টিম ছায়া তদন্ত শুরু করেছে। এখনো আমরা তেমন কিছু পাইনি, বিস্তারিত আপনাদের পরে জানাবো।
এদিকে দুপুরে ঘটনা স্থল পরিদর্শন শেষে ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার শামীমা পারভীন বলেন, এটা কোন মব'র ঘটনা না। ওই পুলিশ সদস্য নামাজ পরার জন্য যাওয়ার পথে রিকশা গ্যারেজের মালিককে সন্ত্রাসীরা মারধর করতে থাকে। বিষয়টি দেখতে পেয়ে স্বাভাবিকভাবেই যেহেতু তিনি একজন পুলিশ কর্মকর্তা, তাই তিনি এগিয়ে গিয়ে এর প্রতিবাদ করেন। এ সময় ওই ব্যক্তিরা পুলিশ কর্মকর্তাকে মারধর করে। পরে সে পাশেই তার ছেলের গেঞ্জি কারখানায় আত্ম রক্ষার্থে উপস্থিত হয়। সেখানে ঢুকেই তাকে সহ তার ছেলেকে মারধর করে। তোর হাসপাতালে নেওয়ার পর ডাক্তার পুলিশ কর্মকর্তাকে মৃত ঘোষণা করেন। পুলিশ সুপার আরও বলেন, সন্ত্রাসী মাদক ব্যবসায়ী নির্মূল পুলিশের একার পক্ষে সম্ভব নয়। জনগণকেও পুলিশকে সহযোগিতা করতে হবে। পুলিশ সদস্যের উপর হামলার ঘটনায় আশপাশের জনকন যদি এগিয়ে আসতো তাহলে হয়তো সে মারা যেত না।